ফ্রিল্যান্সাররা বাদে কেউ কোচিং করাতে পারবেন না : হাইকোর্ট

0
195

আদালত প্রতিবেদক : :

কোচিং সংক্রান্ত নীতিমালার আলোকে দেশের সরকারি কিংবা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্য কোচিং বন্ধ হলেও ফ্রিল্যান্সাররা কোচিং করাতে পারবেন বলে জানিয়েছেন উচ্চ আদালত। এ সংক্রান্ত একটি রায় প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। ওই রায় অনুসারে ফ্রিল্যান্সাররা বাদে কেউ কোচিং বাণিজ্য করতে পারবেন না।

সরকারের নেয়া ২০১২ সালের ওই নীতিমালা অনুসারে দেশের সরকারি কিংবা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা কোচিং করাতে পারবেন না। তবে যেসব ব্যক্তি কোনও প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত নন, যারা ফ্রিল্যান্সার, তারা এর আওতায় পড়বেন না।

আদালতে সোমবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বিষয়টি স্বচ্ছ করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খানকে উদ্দেশ করে সোমবার আদালত এই বিষয়ে মন্তব্য করেন।

আদালত থেকে বের হওয়ার পর খুরশীদ আলম গণমাধ্যমকে জানান, অন্য একটি মামলায় আজ (১১ফেব্রুয়ারি) আমি এই আদালতে উপস্থিত ছিলাম। একপর্যায়ে আদালত আমাকে ডেকে জানান, কোচিং নিয়ে বিচারপতিরা টেলিভিশনে আমার দুটি টকশো দেখেছেন। তাই কোচিং এর সংজ্ঞা নিয়ে বিচারপতিরা বক্তব্য স্পষ্ট করে এ বিষয়ে আমার কাছে মন্তব্য করেন।

আদালত আমাকে জানান, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বাইরে যারা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত তারা তাদের কার্যক্রম চালু রাখতে পারবেন। তবে যারা কোনও প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত তাদের ক্ষেত্রে সরকারের করা কোচিং বাণিজ্য বন্ধের ২০১২ সালের নীতিমালা প্রযোজ্য হবে।’

আদালতের এই বক্তব্যের ফলে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালের নীতিমালা অনুসারে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদানে যুক্ত শিক্ষকগণ কোনোভাবেই কোচিং করাতে পারবেন না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২ এর ১ (ক) অনুচ্ছেদে ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ বলতে, সরকারি/বেসরকারি স্কুল (নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক), কলেজ (উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর) মাদ্রাসা (দাখিল, আলিম, ফাজিল, কামিল) ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে বোঝানো হয়েছে।

এছাড়াও ১ (চ) অনুচ্ছেদে ‘কোচিং’ বলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চলাকালীন শিক্ষকের নির্ধারিত ক্লাসের বাইরে বা এর পূর্বে অথবা পরে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে/বাইরে কোনও স্থানে পাঠদান করাকে বোঝাবে এবং ১ (ছ) অনুচ্ছেদ অনুসারে ‘কোচিং বাণিজ্য’ বলতে, উপানুচ্ছেদ (চ) অনুযায়ী বিভিন্ন জাতীয়/দৈনিক/স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি, পোস্টার, লিফলেট, ফেস্টুন, ব্যানার, দেয়াল লিখন অথবা অন্য কোনও প্রচারণার মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে কোচিং কার্যক্রম পরিচালনা করাকে বোঝানো হয়েছে।

গত ০৭ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং–বাণিজ্য বন্ধে সরকারের করা নীতিমালা বৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওইদিন এ রায় দেন।

বিভিন্ন আইন ও তথ্যাদি পর্যালোচনা করে আদালত বলেন, এই নীতিমালা একটি সারবত্তাসম্পন্ন আইন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আচরণবিধি ও রেগুলেশন দিয়ে পরিচালিত হয়ে থাকে। সরকারের অনুমোদন ছাড়া বিধি অনুসারে তাঁরা কোনো ব্যবসা ও অন্যান্য লাভজনক কাজ করতে পারেন না। সরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষকেরা পাবলিক সার্ভেন্ট। শৃঙ্খলা বিধি তাঁদের কোচিং–বাণিজ্য সমর্থন করে না, যা বিধিতে পেশাগত অসদাচরণ হিসেবে দেখা হয়েছে। এমনকি জাতীয় শিক্ষা নীতিতে কোচিং–বাণিজ্য নিষেধ করা রয়েছে। ওই সব বিধিবিধানে কোচিং–বাণিজ্যকে অনুমোদন দেয় না। যা নীতিমালার মাধ্যমে এর প্রতিফলন হয়েছে।

ঘোষিত ওই রায়ে বলা হয়, আধুনিক বিশ্বে বিভিন্ন সার্কুলার ও পরিপত্র দিয়ে প্রশাসনিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। সরকার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনে সময়–সময় পরিপত্র, নীতিমালা, গাইডলাইন, সার্কুলার, বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারে, তবে তা কারও মৌলিক অধিকার ও আইনে স্বীকৃত অধিকারকে খর্ব করতে পারবে না। প্রশাসনিক কাজ চালাতে গিয়ে সরকারকে এ ধরনের সার্কুলার জারি করতে হয়। সব ক্ষেত্রেই সংসদের কর্তৃত্বে তা হতে হবে তেমন নয়। এ ক্ষেত্রে আইন রিট আবেদনকারী শিক্ষকদের কোচিং–বাণিজ্যে সংশ্লিষ্ট থাকার অধিকার দেয়নি। নীতিমালার মাধ্যমে রিট আবেদনকারী শিক্ষকদের মৌলিক অধিকারও খর্ব করা হয়নি। তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসংশ্লিষ্ট প্রবিধান দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়।

এদিকে, দুদক কোচিং–বাণিজ্যের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করতে পারে কি না, এই প্রসঙ্গও রায়ে আসে। আদালত বলেন, দুদক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের ক্ষেত্রে দুদক তদন্ত করতে পারে। তবে বেসরকারি শিক্ষকের বিষয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করতে পারে না। দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তে দুদকের অগ্রাধিকার তালিকা থাকা উচিত, যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য দুদকের জনবলের সংকট রয়েছে। কাস্টম হাউস, ভূমি অফিস ও আদালত প্রাঙ্গণ যেখানে দুর্নীতির সম্পৃক্ততার ইস্যু রয়েছে, সেখানে এ ধরনের শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়ে দুদকের সম্পৃক্ততা সমীচীন নয়। দুর্নীতির ইস্যু বলতে যা বোঝানো হয়, তাতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক যথাসময়ে স্কুলে গেলেন কি গেলেন না, তা অনুসন্ধান ও তদন্তের তালিকার তলানিতে থাকা উচিত।

নীতিমালার পূর্বাপর : কোচিং–বাণিজ্য বন্ধে নির্দেশনা চেয়ে ২০১১ সালে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অভিভাবক ফোরামের (মতিঝিল-বনশ্রী শাখা) তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল কবির দুলু হাইকোর্টে একটি রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওই বছরের ৭ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল দেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও সরকারি শিক্ষকদের কোচিং দেওয়া নিষিদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং এই ঘোষণা গেজেট আকারে প্রকাশের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না রুলে তা জানতে চেয়ে রুল দেওয়া হয়। এই রুল অকার্যকর ঘোষণা করা হয় রায়ে।

এরপর ২০১২ সালের ২০ জুন সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং–বাণিজ্য বন্ধে ওই নীতিমালা করে। ওই নীতিমালা উদ্দেশ্য প্রণোদিত দাবি করে ২০১২ সালের ৮ আগস্ট অপর রিটটি করেন অভিভাববক সমিতির তৎকালীন সভাপতি মিজানুর রহমানসহ পাঁচ অভিভাবক। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট নীতিমালা প্রশ্নে রুল দেন। এই রুল খারিজ হয়।

এমপিওভুক্ত চার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭২ জন শিক্ষক ও সরকারি চারটি বিদ্যালয়ের ২৫ জন শিক্ষক কোচিং–বাণিজ্যে যুক্ত বলে দুদক প্রমাণ পেয়ে জানিয়ে ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর চিঠি পাঠানো হয়। গত বছরের জানুয়ারিতে বিভিন্ন সরকারি স্কুলের ২৫ শিক্ষককে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় বদলির আদেশ দেওয়া হয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে কোচিং–বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজধানীর নামকরা চার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৭২ শিক্ষককে কারণ দর্শাতে বলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

শিক্ষকদের তিন রিট : এ অবস্থায় ওই নীতিমালা ও কারণ দর্শানোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারহানা খানম রিট করেন। একই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রুল দেন। কারণ দর্শানোর নোটিশ স্থগিত করা হয়। রায়ে ওই কারণ দর্শানোর চিঠি অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

রিট আবেদনকারীপক্ষ জানায়, কারণ দর্শনো ও বদলির আদেশের বিরুদ্ধে শাজাহান সিরাজসহ সরকারি ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের আট শিক্ষক গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ১২ বছরের ফেব্রুয়ারি ওই কারণ দর্শানোর চিঠি ও বদলির আদেশের প্রশ্নে রুল দেন। বদলির আদেশ স্থগিত হয়। পরে ওই আদেশ আপিল বিভাগে স্থগিত হয়। ০৭ ফেব্রুয়ারি এই রুল খারিজ হয়।

print

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here