ভালোবাসার অশ্রুজলে সুবীর নন্দীকে বিদায়

0
56

লিড-নিউজ ডেস্ক ::

বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী সুবীর নন্দীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছে সবর্স্তরের মানুষ। প্রয়াত সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দীকে শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষিরা। সবার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বুধবার সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয় বরেণ্য এই শিল্পীর মরদেহ।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের এই আয়োজনে শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান, উপ-উপাচার্য মুহাম্মদ সামাদ, জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, গীতিকার রফিকুজ্জামান, সঙ্গীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ, এন্ড্রু কিশোর, রবি চৌধুরী, ফকির আলমগীর, নকিব খান, ক্লোজআপ ওয়ান তারকা নিশিতা বড়ুয়াসহ আরও অনেকে।

এরপর দুপুর পৌনে ১টায় এফডিসিতে নেয়া হয় নন্দিত এ শিল্পীর মরদেহ। সেখানে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হাজির হন পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার, সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম খোকন, বাংলাদেশ শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান, অভিনেতা আলমগীর, পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান, ওমর সানি, জয় চৌধুরী, অরুণা বিশ্বাস, ড্যানি সিডাক, পরিচালক শাহ আলম কিরণ, পরিচালক গাজী মাহাবুব, এফডিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা হিমাদ্রি বড়ুয়াসহ আরও অনেকেই। শ্রদ্ধা শেষে তার মরদেহ নেওয়া হয় সবুজবাগের বরদেশ্বরী কালী মন্দিরের শ্মশানে। বুধবার বিকেলে সেখানেই তার শেষকৃত্য হবে।

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় ভোররাত ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত এ সংগীতশিল্পী। সুবীর নন্দীর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সুবীর নন্দী দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও হার্টের অসুখে ভুগছিলেন।

গত ১৪ এপ্রিল মৌলভীবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ট্রেনে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সুবীর নন্দী। ট্রেনের এক চিকিৎসকের পরামর্শে ওই দিন রাত ১১টার দিকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয় তাকে। পরে সুবীর নন্দীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয় তাকে। সেখানে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন এ সংগীতশিল্পী।

১৮ দিন সিএমএইচে চিকিৎসাধীন থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য ৩০ এপ্রিল সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। ওই দিন বিকেলে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে শুরু হয় তার চিকিৎসা। বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর নেওয়ার দুই দিন পর কিছু উন্নতি হয় সুবীর নন্দীর। পরে আবার অবনতি হওয়া শুরু করে তার শারীরিক অবস্থার। সেখানে চিকিৎসা চলাকালে তিনবার হূদরোগে আক্রান্ত হন তিনি।

১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানার নন্দী পাড়া মহল্লায় সম্ভ্রান্ত সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সুধাংশু নন্দী ছিলেন একজন চিকিৎসক ও সংগীতপ্রেমী। মা পুতুল রানী চমৎকার গান গাইতে জানলেও পেশাদারিত্বে আসেননি। ছোটবেলা থেকেই ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে ভাই বোনদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সংগীত তালিম নিয়েছেন সুবীর নন্দী। ১৯৬৩ সালে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়া অবস্থাতেই গান করতেন সুবীর নন্দী। সিলেট বেতারে প্রথম গান করেন ১৯৬৭ সালে। ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রের্কডিংয়ের মাধ্যমে গানের জগতে আসেন বরেণ্য এ শিল্পী।

দীর্ঘ ৪০ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি গান। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গান গেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি। ১৯৭৬ সালে আবদুস সামাদ পরিচালিত ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন সুবীর নন্দী। তার প্রথম একক অ্যালবাম বাজারে আসে ১৯৮১ সালে।

‘দুঃখের পরে সুখ’, ‘প্রেম বলে কিছু নেই’, ‘ভালোবাসা কখনো মরে না’, ‘সুরের ভুবন’সহ আরও বেশ কয়েকটি স্টুডিও অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে এ শিল্পীর। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তার মধ্যে ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘মহানায়ক’, ‘চন্দ্রনাধ’, ‘শুভদা’, ‘পরিণীতা’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘শত্রু শত্রু খেলা’, ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’, ‘অবুঝ বউ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

‘মহানায়ক’ ছবির জন্য ১৯৮৪ সালে, ‘শুভদা’ ছবির জন্য ১৯৮৬ সালে, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ছবির জন্য ১৯৯৯ সালে, ‘মেঘের পরে মেঘ’ ছবির জন্য ২০০৪ সালে এবং ‘মহুয়া সুন্দরী’ ছবির জন্য ২০১৫ সালে শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পীর ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেন গুণী এ সংগীতশিল্পী। এছাড়া ১৯৭৭, ১৯৮৫, ১৯৮৬ সালে একই ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। গেল বছর ১৩তম চ্যানেল আই সংগীত পুরস্কারে ‘আজীবন সম্মাননা’প্রদান করা হয় তাকে।

সর্বশেষ ২০১৯ সালে শিল্পকলায় (সংগীত) বিশেষ অবদানের জন্য ‘একুশে পদক’ পান সুবীর নন্দী।

print

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here