ভাঙ্গায় মাস্ক তৈরি করে গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়ালেন মা মেয়ে

0
1269

মামুনুর রশিদ :: দেশ থেকে দেশান্তর জুড়ে মরণঘাতক হিসাবে যখন করোনা ভাইরাস পরিচিত লাভ করেছে ঠিক সেই মুহূর্তে” গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয়, নহে কিছু মহিয়ান”। কবির মানবিক ভাষার প্রতিপাদ্যকে বুকে নিয়ে নিজেদের ঝুঁকি জানা সত্যেও ফরিদপুরের ভাঙ্গায় মা এবং মেয়ে প্রতিবেশীদের করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি সুতি কাপড় কিনে মাস্ক তৈরি করে বিনামূল্যে অসহায় পরিবারগুলোর মাঝে বণ্টন করছেন বাড়িতে বাড়িতে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রায় তিনশত গ্রামবাসীকে মাস্ক বিতরণ করেছেন তারা।

সৃষ্ট ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মা ও মেয়ে দুজনে।

সরজমিনে আজ সকালে চুমুরদি ইউনিয়নের পূর্ব সদরদী গ্রামে জেসমিন আক্তারের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, মা পূর্ব সদরদী এবং মেয়ে শারমীন রহমান সুইট ঘারুয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। জেসমিন আক্তার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তার স্বামী ছিলেন ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ নেতা। প্রায় ১৮ বছর আগে মারা গেছেন তিনি। স্বামীর কাছ থেকেই মানবিক চেতনায় মানুষের পাশে দাঁড়াবার মানবিক মন্ত্র গ্রহণ করে ছিলেন এই মা।

একইভাবে নিজের ৪ সন্তানকে পিতার আদর্শের পাশাপাশি কিভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে সেই মানবিক চেতনার সৃষ্টিসহ সুশিক্ষিত করে তুলেছেন নিজের সন্তানদের শিক্ষক জেসমিন আক্তার তুলন।

বড় মেয়ে শারমিন রহমান সুইট সহকারী শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি শারমিন রহমান লিখছেন ছোটগল্প। অমর একুশে বইমেলা ২০২০ এ তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ” কয়েদি নম্বর ৩৩২” প্রকাশিত হয়েছে। বইটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। তার মা আরও জানালেন, ভাঙ্গার সন্তান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রকার প্রয়াত তারেক মাসুদকে নিয়ে নতুন করে লিখতে শুরু করেছেন সুইট। আশাবাদ আগামী বই মেলায় পাঠকের হাতে পৌঁছে যাবে লেখক শারমিন রহমান সুইট-এর ২য় বই।

মেজ মেয়ে শ্রাবন্তী রহমান। সেও মেধাবী শিক্ষার্থী। লেখাপড়া করছেন দক্ষিণবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বলে খ্যাত ফরিদপুর সরকারী রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে শ্রাবন্তি ইসলামের ইতিহাসে মাস্টার্স করছে।

ছোট মেয়ে মারিয়া রহমান নীদ। সে ঢাকা ইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী। একমাত্র ছেলে তরিকুল ইসলাম তরিকুল ইসলাম স্কলারশিপ নিয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন ঢাকায় ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সাধারণ জনগণের ভাষ্যমতে, চুমুরদী ইউনিয়নের পূর্ব সদরদী গ্রামের মৃত লুতফর লুৎফর রহমানের পরিবারটি শিক্ষিত পরিবারের পাশাপাশি তার স্ত্রী জেসমিন আক্তার সন্তানদের যেভাবে মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা, মানুষের দুঃসময়ে পাশে থেকে কাজ করা, নিজেকে আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে উঠার প্রেরণা শুধু একজন রত্নগর্ভা মায়ের বেলায় সম্ভ্যব!

দেশের করোনা ভাইরাস প্রাক্কালে পরিবারের সদস্যরা প্রতিবেশীদের সচেতন করার পাশাপাশি নিজেরাই মাস্ক তৈরি করে বিনামূল্যে তা বিতরণ করার এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গ্রামবাসী আজীবন মনে রাখবে বলে এমনটি অভিমত তাদের অনেকের।

প্রতিবেদক আজ সকালে শিক্ষিকা জেসমিন আক্তারের বাড়িতে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, মা-মেয়ে একটি মেশিন নিয়ে মাস্ক তৈরি কাজে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় তার। তার নিজের মুখ থেকে ফুটে উঠেছিল গোটা বিশ্বসহ বাংলাদেশেও কিভাবে করোনা ভাইরাস আতংক ছড়িয়ে পড়ার কথা। এছাড়া গত কয়েকদিনে ৫ জনের মৃত্যুর খবর ব্যথিত করেছে মা ও মেয়ের হৃদয়।

যদিও ভাঙ্গায় এখনও কোন করোনা রোগী সনাক্ত হয় নি। কিন্তু নিজের পরিবার থেকে সীমিত আয়ের প্রতিবেশীদের কথা ভেবে তারা বেশ চিন্তিত ছিলেন। তাদের সর্বশেষ ভাষ্য ছিল, (মা-মেয়ের) সীমিত আয়ের থেকে প্রতিবেশীদের জন্য কিছু করতে হবে?

সেই প্রাধান্য দিয়েই মা ও মেয়ে সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকেই প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। দরকার হলে আরও কিছু করারও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রতিবেদকের কাছে।

বিনামূল্যে মাস্ক পাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রতিবেশী সুমি আক্তার নিজের অভিমত প্রকাশ করেন, আমাদের প্রতিবেশী দুই শিক্ষিকার মত যদি সবার মনে নিজেদের পাড়া প্রতিবশীর চেতনা সৃষ্টি হয় তাহলে আমরা সবাই করোনা ভাইরাস থেকে অনেকটাই মুক্ত হতে পারবো।

তিনি আরও বলেন, মাস্ক নিজেরা তৈরি করার পর বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে শুধু বিলি করে তারা ক্ষান্ত নয়। কিভাবে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে হলে ভাল করে সাবান দিয়ে হাত ধৌত করতে হবে, রুমাল বা টিস্যু ব্যবহারসহ বিভিন্ন নিয়মাবলী সম্পর্কেও সচেতন করছেন মা ও মেয়ে।

শারমিন রহমান সুইট বলেন, ছোট বেলায় বাবাকে হারিয়েছি। কিন্তু মা আমাদের বাবার অভাব পূরণ করেছেন। করোনা ভাইরাস প্রভাব পড়তেই গত ক’দিন আগে মায়ের সাথে আলাপ করি প্রতিবেশীদের অনেকেই এই বিষয়ে অসচতেন। তারা অনেকেই জানে না করোনা ভাইরাস থেকে কিভাবে নিজেকে সুরক্ষিত করতে হবে?  হাঁচি বা কাশি কিভাবে দিতে হবে এও জানে না তারা। আবেগ আপ্লুত ভাষায় বলেন, আমার বাবা বেঁচে থাকলে হয়ত তিনিও আমাদের সাথে মানুষের জন্য এভাবেই কাজ করতেন! বাবা নেই কিন্তু আমরা আছি।

আমাদের থেকে গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করা দরকার। ফের বলেন, আমার কথা শুনে মাও বললেন, কিছু করতে হবে।

মায়ের অনুপ্রেরণায় প্রথমে হাত ধোয়া, হাচিকাশি নিয়ে গ্রামবাসীদের সচেতন করি। এরপর আমাদের সীমিত আয়ের কিছু অংশ বাঁচিয়ে বাজার থেকে সুতি কাপড় কিনে নিয়ে আসি। পরে তা দিয়ে মাস্ক তৈরি করে তিন শতাধিক গ্রামবাসীর বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বিতরণ করি।

উল্লেখ্য, জেসমিন আক্তার বীরমুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত কাশেম মাতুব্বরের (চুমুরদি গ্রাম) মেয়ে এবং ভাঙ্গার খবর পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক সিনিয়র সাংবাদিক মেহেদী হাসান তুষারের বড় বোন। লেখিকা সুইট সাংবাদিকের ভাগ্নি।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে মাস্ক তৈরি করে গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন মা মেয়ে সামাজিক মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পরই তা নজরে আসে জাতীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল লিড-নিউজ২৪ডট কম এর। আমরা আজ সেই মহীয়সী মা ও মেয়ের মানবসেবার কথা পাঠকের সামনে তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রয়াস করেছি। আমরা চাই দেশের সকল শিক্ষক পরিবার সরকারের পাশাপাশি দেশের মানুষের কল্যাণে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে এভাবে এগিয়ে আসবে।

print

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here